Dhaka ১২:৫২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬, ২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কাশিয়ানীতে লটারীর নামে ‘জুয়া’, নিঃস্ব হাজারো মানুষ

  • Reporter Name
  • Update Time : ১২:৫৭:৪৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬
  • ২ Time View

জেলা প্রতিনিধি, গোপালগঞ্জ: সাদ্দাম হোসেন (৩৫)। পেশায় একজন ব্যবসায়ী। লটারিতে একটা মোটরসাইকেল জিতে ভাগ্য বদলানোর আশায় এ পর্যন্ত তিনি ১ লাখ ৯ হাজার টাকার লটারির টিকিট কিনেছেন। শুধু সাদ্দামই নয়, লটারির নেশায় নিঃস্ব হচ্ছেন হাজারো চায়ের দোকানদার, ভ্যানচালক, দিনমজুর ও নিম্নআয়ের মানুষ। ঘরে ঘরে দেখা দিয়েছে পারিবারিক অশান্তি, ধ্বংস হচ্ছে যুবসমাজ। চটকদার পুরস্কারের লোভ দেখিয়ে প্রতিদিন খেটে খাওয়া মানুষের লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি প্রভাবশালী চক্র। প্রশাসনের সামনে এ অবৈধ কর্মকাণ্ড চললেও নীরব ভূমিকা পালন করছেন তারা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ১৫ মে থেকে উপজেলার বিশ্বনাথপুর মাঠে মাসব্যাপী বৈশাখী মেলা শুরু হয়। মেলায় বিনোদনের জন্য রয়েছে সার্কাস, নাগরদোলা, যাত্রা ও শিশুদের নানা ধরণের রাইড। বিনোদনের আড়ালে মূল আকর্ষণ লটারি ড্র। কাশিয়ানীসহ পার্শ্ববর্তী আলফাডাঙ্গা, বোয়ালমারী ও মুকসুদপুর উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে দৈনিক প্রায় দেড় শতাধিক ইজিবাইক ও ভ্যানে মাইকিং করে এ লটারির টিকিট বিক্রি করা হচ্ছে। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে এ বিক্রি।

বিক্রেতারা জানান, দেড় শতাধিক ভ্যান-ইজিবাইক একটি করে ড্রাম রয়েছে। প্রত্যেকটি ভ্যান-ইজিবাইক থেকে প্রতিদিন ৮শ’ থেকে ১ হাজার টিকিট বিক্রি হয়ে থাকে। সে হিসেবে প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ টাকার টিকিট বিক্রি হয়। ২০ টাকা মূল্যের এ লটারীতে পুরস্কার হিসেবে থাকছে-মোটরসাইকেল, রঙিন টেলিভিশন, ইজিবাইক, সোনার গয়না ও নগদ টাকাসহ একাধিক পুরস্কার। লটারি বিক্রি করে প্রতিদিন একটি চক্র ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। লাভবান হচ্ছে কতিপয় ব্যক্তিরা, আর নিঃস্ব হচ্ছে সাধারণ মানুষ।

অভিযোগ রয়েছে, পুরস্কারের আশায় প্রতিদিন হাজার হাজার টাকার টিকিট কিনে সর্বশান্ত হচ্ছে হাজারও খেটে খাওয়া-দিনমজুর মানুষ। অনেক ভ্যানচালক সারাদিনের উপার্জিত আয় দিয়ে লটারির টিকেট কিনছেন। এতে অনেকে ঘরে দেখা দিয়েছে পারিবারিক অশান্তি। লটারী ড্র স্থানীয় ক্যাবল টিভি চ্যানেলের মাধ্যমেও প্রচার করছে। ফলে রাত ১০ থেকে লটারী ড্র’র ফলাফল দেখার জন্য শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষ টিভি চ্যানেলের সামনে বসে থাকে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আয়োজক কমিটির একজন রাজনৈতিক একটি দলের নাম উল্লেখ করে জানান, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের মদদে এবং প্রশাসনকে ম্যানেজ করে এ লটারী বিক্রি করা হচ্ছে। যে কারণে লটারী অবৈধ হলেও কেউ ব্যবস্থা নিবেন না।

আলফাডাঙ্গা উপজেলার জাটিগ্রামের বাসিন্দা রফিক মিয়া বলেন, ‘আমি পুরস্কারের আশায় প্রতিদিন ১০০ লটারী কিনি। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো পুরস্কার পাইনি। মেলা যে কয়দিন থাকবে, আমি লটারী কিনব।’

মেলার আয়োজক কমিটির সাধারণ সম্পাদক খান কামরুজ্জামান লটারী বিক্রি বৈধ দাবি করে তিনি বলেন, ‘লটারী বিক্রির অনুমতি আছে। ডিসি স্যার অনুমতি দিয়েছেন। লটারী নামে তো চলে না, এটা মূলতো র‌্যাফেল ড্র। হাইকোর্টেরও অনুমতি আছে।’

কাশিয়ানী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শাহিন মিয়া বলেন, ‘ডিসি অফিস থেকে তাদেরকে বৈশাখী মেলার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।’ তবে লটারী বিক্রির বিষয় জানতে চাইলে তিনি লটারী বিক্রি ‘বৈধ’ ও ‘অবৈধ’ কোনোটাই বলতে রাজি নন। কৌশলে বিষয়টি এড়িয়ে যান।’

এ বিষয় গোপালগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. আরিফ-উজ-জামান কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি। ব্যস্ততা দেখিয়ে তিনি সাংবাদিকদের এড়িয়ে যান।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

কাশিয়ানীতে লটারীর নামে ‘জুয়া’, নিঃস্ব হাজারো মানুষ

কাশিয়ানীতে লটারীর নামে ‘জুয়া’, নিঃস্ব হাজারো মানুষ

Update Time : ১২:৫৭:৪৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬

জেলা প্রতিনিধি, গোপালগঞ্জ: সাদ্দাম হোসেন (৩৫)। পেশায় একজন ব্যবসায়ী। লটারিতে একটা মোটরসাইকেল জিতে ভাগ্য বদলানোর আশায় এ পর্যন্ত তিনি ১ লাখ ৯ হাজার টাকার লটারির টিকিট কিনেছেন। শুধু সাদ্দামই নয়, লটারির নেশায় নিঃস্ব হচ্ছেন হাজারো চায়ের দোকানদার, ভ্যানচালক, দিনমজুর ও নিম্নআয়ের মানুষ। ঘরে ঘরে দেখা দিয়েছে পারিবারিক অশান্তি, ধ্বংস হচ্ছে যুবসমাজ। চটকদার পুরস্কারের লোভ দেখিয়ে প্রতিদিন খেটে খাওয়া মানুষের লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি প্রভাবশালী চক্র। প্রশাসনের সামনে এ অবৈধ কর্মকাণ্ড চললেও নীরব ভূমিকা পালন করছেন তারা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ১৫ মে থেকে উপজেলার বিশ্বনাথপুর মাঠে মাসব্যাপী বৈশাখী মেলা শুরু হয়। মেলায় বিনোদনের জন্য রয়েছে সার্কাস, নাগরদোলা, যাত্রা ও শিশুদের নানা ধরণের রাইড। বিনোদনের আড়ালে মূল আকর্ষণ লটারি ড্র। কাশিয়ানীসহ পার্শ্ববর্তী আলফাডাঙ্গা, বোয়ালমারী ও মুকসুদপুর উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে দৈনিক প্রায় দেড় শতাধিক ইজিবাইক ও ভ্যানে মাইকিং করে এ লটারির টিকিট বিক্রি করা হচ্ছে। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে এ বিক্রি।

বিক্রেতারা জানান, দেড় শতাধিক ভ্যান-ইজিবাইক একটি করে ড্রাম রয়েছে। প্রত্যেকটি ভ্যান-ইজিবাইক থেকে প্রতিদিন ৮শ’ থেকে ১ হাজার টিকিট বিক্রি হয়ে থাকে। সে হিসেবে প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ টাকার টিকিট বিক্রি হয়। ২০ টাকা মূল্যের এ লটারীতে পুরস্কার হিসেবে থাকছে-মোটরসাইকেল, রঙিন টেলিভিশন, ইজিবাইক, সোনার গয়না ও নগদ টাকাসহ একাধিক পুরস্কার। লটারি বিক্রি করে প্রতিদিন একটি চক্র ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। লাভবান হচ্ছে কতিপয় ব্যক্তিরা, আর নিঃস্ব হচ্ছে সাধারণ মানুষ।

অভিযোগ রয়েছে, পুরস্কারের আশায় প্রতিদিন হাজার হাজার টাকার টিকিট কিনে সর্বশান্ত হচ্ছে হাজারও খেটে খাওয়া-দিনমজুর মানুষ। অনেক ভ্যানচালক সারাদিনের উপার্জিত আয় দিয়ে লটারির টিকেট কিনছেন। এতে অনেকে ঘরে দেখা দিয়েছে পারিবারিক অশান্তি। লটারী ড্র স্থানীয় ক্যাবল টিভি চ্যানেলের মাধ্যমেও প্রচার করছে। ফলে রাত ১০ থেকে লটারী ড্র’র ফলাফল দেখার জন্য শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষ টিভি চ্যানেলের সামনে বসে থাকে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আয়োজক কমিটির একজন রাজনৈতিক একটি দলের নাম উল্লেখ করে জানান, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের মদদে এবং প্রশাসনকে ম্যানেজ করে এ লটারী বিক্রি করা হচ্ছে। যে কারণে লটারী অবৈধ হলেও কেউ ব্যবস্থা নিবেন না।

আলফাডাঙ্গা উপজেলার জাটিগ্রামের বাসিন্দা রফিক মিয়া বলেন, ‘আমি পুরস্কারের আশায় প্রতিদিন ১০০ লটারী কিনি। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো পুরস্কার পাইনি। মেলা যে কয়দিন থাকবে, আমি লটারী কিনব।’

মেলার আয়োজক কমিটির সাধারণ সম্পাদক খান কামরুজ্জামান লটারী বিক্রি বৈধ দাবি করে তিনি বলেন, ‘লটারী বিক্রির অনুমতি আছে। ডিসি স্যার অনুমতি দিয়েছেন। লটারী নামে তো চলে না, এটা মূলতো র‌্যাফেল ড্র। হাইকোর্টেরও অনুমতি আছে।’

কাশিয়ানী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শাহিন মিয়া বলেন, ‘ডিসি অফিস থেকে তাদেরকে বৈশাখী মেলার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।’ তবে লটারী বিক্রির বিষয় জানতে চাইলে তিনি লটারী বিক্রি ‘বৈধ’ ও ‘অবৈধ’ কোনোটাই বলতে রাজি নন। কৌশলে বিষয়টি এড়িয়ে যান।’

এ বিষয় গোপালগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. আরিফ-উজ-জামান কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি। ব্যস্ততা দেখিয়ে তিনি সাংবাদিকদের এড়িয়ে যান।